জনগণের শক্তি দিয়েই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করা হবে- প্রধানমন্ত্রী


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলে জনগণের শক্তি দিয়েই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশব্যাপী জনসচেতনতা গড়ে তুলে জনগণের শক্তি দিয়েই আমাদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে মোকাবিলা করতে হবে।’ প্রধানামন্ত্রী গতকাল গণভবন থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবন, রাঙ্গামাটি, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুরসহ ১৫টি জেলার সরকারি কর্মকর্তা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী, এনজিওকর্মী, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষকদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে এ আহ্বান জানান। জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর
উদ্যোগের অংশ হিসেবে গতকাল এ কনফারেন্স করেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম এবং ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন সিকদার ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যখন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপী এত উজ্জ্বল, যখন আমরা আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছি সেই সময় এই ঘটনা ঘটিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করা, উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা, দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়ার একটা ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, আমি মনে করি আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমন করতে হবে, বাংলাদেশকে এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত করতে হবে, মানুষের জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকলের শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমি মনে করি- আমাদের মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষকবৃন্দ, অভিভাবকবৃন্দ, প্রশাসনে যারা কর্মরত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা (যেমন- পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, আনসার-ভিডিপি), জনপ্রতিনিধিরা আছেন (ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, মহানগর, জেলা এবং সংসদ সদস্যবৃন্দ) এবং সমাজসেবক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যারা আছেন সকলকেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এই জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আজকে তার সরকার বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছে, মানুষের সামগ্রিক আয় বৃদ্ধি করেছে, খাদ্যে দেশ স্বয়ংসম্পন্ন হয়েছে। আজকে মানুষের মধ্যে আর সেই হাহাকার  নেই। তিনি বলেন, আমরা দারিদ্র্যবিমোচন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গৃহায়ন কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র জনগণকে ঘর-বাড়ি করে দিচ্ছি, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছি- যতদূর সম্ভব আমরা দেশের সেবা করে যাচ্ছি, মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী প্রকৃত অর্থে ইসলাম ধর্মেরই ক্ষতি সাধন করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন মানুষের কল্যাণ হচ্ছে, মানুষের মাঝে একটা স্বস্তি ফিরে এসেছে, আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে ঠিক সেই সময় এই ঘটনাটি ঘটিয়ে আমাদের সমগ্র বিশ্বের সামনে যেমন আমদেরকে হেয় করছে সেই সঙ্গে আমি মনে করি-মুসলমান হয়ে মুসলমানকে হত্যা করে এই পবিত্র ইসলাম ধর্মটাকেই আজকে হেয়-প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। আমাদের এই পবিত্র ধর্মকে কেউ হেয় করবে- এটা আমরা বরদাশ্‌ত করবো না। তিন পিতা-মাতা, অভিভাবকদের উদ্দেশে এই প্রশ্ন উত্থাপন করে নিজেদের সন্তানদের প্রতি যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জঙ্গিবাদ দমনে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক এলাকায় জঙ্গিবাদ বিরোধী কমিটি, কোর কমিটি গঠন করে আড়ালে-আবডালে ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গি, নিখোঁজ ব্যক্তি এবং গোপন তৎপরতাকে খুঁজে বের করতে সবাইকে তৎপর হতে হবে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তাবৃন্দ নিজ নিজ এলাকায় জঙ্গিবাদ দমনে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করায় তিনি তাদের ধন্যবাদ জানান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দল-মত নির্বিশেষে সকলকে এ ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার মাধ্যমে আমাদের জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একজোট হয়ে দেশের সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি রক্ষায় এবং উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে যেতে হবে। এ সময় তিনি ঈদের জামাতে হিন্দু ভলান্টিয়ারদের নিরাপত্তা প্রহরা দেয়ার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে এটাকেই সকল ধর্ম-বর্ণ র্নির্বিশেষে আবহমান বাংলার চিরায়ত রুপ এবং এই দেশ সাংবিধানিকভাবেই সকল ধর্মবলম্বীদের আবাসস্থল বলেও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও সকলকে সতর্ক করে দেন।
প্রধানমন্ত্রীকে যা বললেন সিলেটের সুধীজন
সিলেট অফিস জানায়, সিলেটের জঙ্গি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন। গতকাল এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এব্যাপারে অবগত করেন। এ সময় তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হবে। বিকাল পৌনে ৩টায় শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিডিও কনফারেন্স। এ সময় শুরুতেই সিলেট জেলার কথা শুনেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমে জেলা প্রশাসক বক্তব্য দেয়ার পর ইমাম প্রতিনিধি হিসেবে হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদের ইমাম হাফিজ মাওলানা আজসদ আহমদ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন দিয়ে বলেন, জঙ্গিরা কোনো ধর্মের বিশ্বাসী নয়। ওরা সন্ত্রাসী। ওরা ইসলামের ক্ষতি করছে। সুতরাং জঙ্গিদের নির্মূল করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রমের সঙ্গে ইমামরাও শরিক থাকবেন। তিনি এ জন্য প্রতি জেলায় জেলায় কনভেনশন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব করেন। পরে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন সুধীজনেরা। সিলেট বিভাগে সবশেষে সংযুক্ত হন বিভাগীয় কমিশনার জামাল উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি সিলেট বিভাগে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমের নানা দিক প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করে বলেন, সিলেট বিভাগে এবার শান্তিপূর্ণ ভাবে রমজান, ঈদ এবং পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ইতিমধ্যে সিলেটের প্রশাসনের উদ্যোগে বিভাগের সবক’টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম শুরু করা হবে। পাশাপাশি বিভাগের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আর সিলেটের জেলা প্রশাসনের ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার রেজাউল করিম, পুলিশ সুপার নুরে আলম মীনা প্রমুখ।

শেয়ার করুন

0 মন্তব্য: