মৌলভীবাজারে জীববৈচিত্র্য বিপন্ন

মানুষের অত্যাচারে বনে ঠাঁই নেই বন্যপ্রাণীদের। তাই ওরা লোকালয়ে জীবন বাঁচাতে এসে জীবন দিচ্ছে লোকজনের হাতে। জেলাজুড়ে জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হওয়ার এমন অঘটন প্রায়ই ঘটছে। নানা জাত ও বর্ণের না দেখা এমন বন্য প্রাণীগুলো মানুষের হাতে ধরা পড়লে কৌতূহলী লোকজন তার সেবা করতে গিয়ে ওল্টো তাদেরই হাতে প্রাণ যাচ্ছে এসকল নিরীহ প্রাণীর। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর পাহাড় আর হাওর বেষ্টিত মৌলভীবাজারের চিরচেনা জীববৈচিত্র্য নানা কারণে এখন দিন দিন কমে যাচ্ছে। নিরাপদ আবাসস্থল আর খাদ্য সংকট এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। জেলার পাহাড়ি বনাঞ্চলগুলো নানা ছুতায় লিজ নিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল। আর  ভরাট, নাব্য হ্রাস ও দখল হওয়া ছাড়াও  নানা কারণে স্থানীয় হাওর ও নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে থাকায় এসকল হাওর ও নদীর জলজ প্রাণীগুলো রয়েছে মহা হুমকিতে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পাহাড়ি বনের বড় বড় ফলদ ও বনজ বৃক্ষ উজাড় করা ছাড়াও টি প্লানটেশনের নামে ধ্বংস করা হচ্ছে বন্য পরিবেশ। ফলদ ও বনজ বৃক্ষ নিধন হওয়া ছাড়া পাহাড়ি বনগুলোর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ছোট ছোট ঝিল, খাল ও নালাগুলোর নাব্য হ্রাস কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে ভরাট করার কারণে বন্যপ্রাণীরা মারাত্মক খাদ্য ও পানি সংকটে পড়ছে। নানা কারণে স্থানীয় হাওর ও নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে থাকায় এসকল হাওর ও নদীর জলজ প্রাণীগুলো রয়েছে মহা হুমকিতে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও  শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখার ছোট-বড় পাহাড়গুলো ছিল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। এ বনাঞ্চলে অবাধে ঘুরে বেড়াত মায়া হরিণ, শির হাঁস, গন্ডার, ময়ূর, মেছোবাঘ, বনমোরগসহ নানা জাত ও বর্ণের বন্যপ্রাণী।  বিভিন্ন পাহাড়ি টিলায় দেখা যেত লজ্জাবতী বানর, হনুমান, বানর, ধনেশ পাখি। কুলাউড়ার ষাঁড়েরগজ পাহাড়ে ও পাশের উপজেলার বনাঞ্চলে দেখা যেত কাঠবিড়ালী, চিল, শকুন, হাতি, ভালুক ও উলুকসহ  নানা প্রজাতির দেশীয় প্রাণী। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের পাহাড়ি বনাঞ্চল গুলি এক সময় ছিল বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। এক যুগ আগেও রাগনার বনে অসংখ্য ভালুক ছিল। সন্ধ্যার পর শ্রীমঙ্গলের অনেক অরণ্যে মেছোবাঘ, চিতাবাঘ ও হাতির ভয়ে মানুষের চলাফেরা করতে সমস্যা হতো। কমলগঞ্জের লাউয়াছড়ার বিশাল বনভূমিতে হাতি, উল্লুক, ভাল্লুক, হরিণ, শিয়াল আর শতাধিক প্রজাতির পাখির দৌড়ঝাঁপ ছিল হরদম। নানা কারণে এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে এসব প্রাণীসহ স্তন্যপায়ী, পাখি, মাছ, সাপ ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। যেগুলো এখনো ঠিকে আছে তারাও বাসস্থান ও খাবারের অনিশ্চয়তায় রয়েছে মহা হুমকিতে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় পরিষদ সদস্য ও মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক আ.স.ম. ছালেহ সুহেল ও মৌলভীবাজার জেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মহসিন পারভেজ ও সাধারণ সম্পাদক নরুল মোহামীন মিল্টন বলেন, অবাধে পাহাড় কাটা, বন জঙ্গল ও ঝোপঝাড় কেটে ফেলা, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, হাওর, জলাশয় আর পুকুর ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণের  কারণেই এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে এসব জীববৈচিত্র্য। গাছপালা কেটে ফেলায় পাখির খাবারের জায়গা কমে যাচ্ছে। হাওর তীরবর্তী এলাকার  ধানী জমিতে  কীটনাশক প্রয়োগের ফলে পোকামাকড় খেয়ে মারা যাচ্ছে পাখি, মাছ, সাপ, ব্যাঙসহ নানা জলজ ও উদ্ভিদ প্রাণী। যে কয়েকটি  প্রাণী এখনো ঠিকে আছে অনেক সময়  খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসায় গ্রামবাসীর হামলায় তারাও প্রাণ হারাচ্ছে। তারা বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। মৌলভীবাজারের জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাওরে পানি নেই পাহাড়ে জঙ্গল নেই, তাহলে প্রাণী থাকবে কি করে।
তিনি বলেন, যে সরকারই ক্ষমতায় যায় তাদেরই লোভ থাকে পাহাড়ের গাছ আর হাওরের মাছের দিকে। প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল আর খাদ্য নিরাপত্তা দিতে না পারলে ওই এলাকার জীববৈচিত্র্যের ঐতিহ্য টিকবে কিভাবে। বন বিভাগের বিভাগীয় অফিস সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও কুলাউড়ায় দুটি নতুন বিট অফিস করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। যাতে ওখান থেকে হাকালুকি হাওর ও পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যের প্রতি আরো ভালোভাবে দেখভাল করা যায়। সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী) মিহির কুমার দো জানান, হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিকটাক থাকলে এ পরিকল্পনায় টি প্লানটেশন নামে এই প্রজেক্টের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে চলমান বছরের শেষের দিকে। এ কাজগুলো বাস্তবায়ন হলে আশা করি মৌলভীবাজারের বিপন্ন জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবসময় সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ রয়েছে। তিনি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সকলকে আরো সচেতনভাবে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান।

শেয়ার করুন

0 মন্তব্য: