জন্ডিস কি কোনো রোগ?

অনেককে বলতে শোনা যায় জন্ডিস রোগ, জন্ডিস আসলে কোনো রোগ নয়। এটি রোগের উপসর্গ মাত্র। রক্তে বিলিরুবিন নামক এক ধরনের হলুদ বর্ণের পিগমেন্টের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়।
জন্ডিস যেভাবে হয়
রক্তের লোহিত কণিকা (জইঈ) একটি স্বাভাবিক নিয়মে ভেঙে গিয়ে বিলিরুবিন তৈরি করে, যা লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সঙ্গে পিত্তনালির মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে। অন্ত্র থেকে বিলিরুবিন পায়খানার মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। বিলিরুবিনের এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে গিয়ে জন্ডিস দেখা দেয়।
জন্ডিসের কারণ
১. লিভারের রোগ
ক. হেপাটাইটিস এ বি সি ডি ও ই ভাইরাস।
এরা লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করে যাকে বলা হয় ভাইরাল হেপাটাইটিস। এর মধ্যে হেপাটাইটিস এ ও ই স্বল্পমেয়াদি, যা পানিবাহিত।
হেপাটাইটিস বি সি ও ডি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ, যা রক্তবাহিত। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক, গর্ভবতী মা থেকে নবজাতকে আসে।
খ. অ্যালকোহল বা মদপান।
গ. কিছু ওষুধ যেমন যক্ষ্মার ওষুধ, প্যারাসিটামল, ব্যথার ওষুধ, খিঁচুনি কমানোর ওষুধ।
ঘ. ফ্যাটি লিভার।
ঙ. লিভার ক্যান্সার।
চ. বংশগত ও অটোইমোনো।
লিভার সমস্যা ছাড়াও জন্ডিস হতে পারে যেমন_
২. পিত্তনালির সমস্যা : পিত্তনালির পাথর, কৃমি, ক্যান্সার, _প্যানক্রিয়াস (অগ্ন্যাশয়) ক্যান্সার।
৩. রক্তনালি ভাঙার কারণ : থ্যালাসেমিয়া
_হিমোগ্লোবিন ই ডিজিজ
৪. এ ছাড়া রক্ত সঞ্চালন (ইষড়ড়ফ ঞৎধহংভঁংরড়হ) সমস্যা
_ম্যালেরিয়ার জ্বর থেকে জন্ডিস হতে পারে।
জন্ডিসের লক্ষণ
১. জন্ডিসের প্রথম ও প্রধান লক্ষণ হলো চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া। পরে হাত-পায়ের তালু, মুখম-ল থেকে শুরু করে সমস্ত শরীরেই হলদেটে হয়ে যেতে পারে।
২. প্রস্রাবের রং হালকা থেকে গাঢ় হলদেটে হয়ে যাওয়া।
৩. বমি বমি ভাব, খাবার দেখলে বা খাবারের গন্ধ পেলে অস্বস্তি লাগা, আহারে অরুচি, ক্ষুধামন্দা।
৪. পায়খানার রং কখনো কাদার মতো, কখনো কালো, কখনো ফেকাসে হয়।
৫. শরীর অত্যন্ত দুর্বল, জ্বর আসা।
৬. পেটে ব্যথা এমনকি লিভার বড় হতে পারে।
৭. ক্ষেত্রবিশেষ এটি জীবননাশকারী অবস্থায় চলে যেতে পারে।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে অবশ্যই একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। বিশেষজ্ঞ শারীরিক লক্ষণ এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জন্ডিসের তীব্রতা ও কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
চিকিৎসা
১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া। ভাইরাল হেপাটাইটিস ৪-৬ সপ্তাহে ভালো হয়ে যায়। ক্ষেত্রবিশেষ হাসপাতালে ভর্তি লাগতে পারে।
২. ব্যথার ওষুধ প্যারাসিটামল, এসপিরিন, ঘুমের ওষুধ, কবিরাজি ওষুধ, ঝাড়-ফুঁক দেয়া উচিত নয়।
৩. প্রচুর তরল, শাক-সবজি, ঝোল খাওয়া।
৪. পায়খানা যাতে শক্ত না হয় তার জন্য খধপঃড়ষড়ংব-জাতীয় ওষুধ সেবন।
৫. হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ, এমনকি লিভারসিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার হতে পারে। তাই এ দুটি ভাইরাস আক্রান্ত হলে দীর্ঘমেয়াদি লিভার বিশেষজ্ঞের ফলোআপে থাকতে হবে। প্রয়োজনে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের চিকিৎসা নিতে হবে।
বাঁচার উপায়
১. সব সময় বিশুদ্ধ খাদ্য ও পানি খেতে হবে কারণ হেপাটাইটিস এ ও ই খাদ্য ও পানির মাধ্যমে সংক্রমিত।
২. শরীরে রক্ত নেয়ার দরকার হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করে নিন, ডিসপোসেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার জরুরি।
৩. হেপাটাইটিস বির টিকা দেশে পাওয়া যায়, বিশেষ করে হেপাটাইটিস বির টিকা প্রত্যেকেরই নেয়া উচিত।
৪. যারা সেলুনে শেভ করেন খেয়াল রাখবেন যেন আগে ব্যবহার করা বেস্নড বা ক্ষুর আবারো ব্যবহার না করা হয়।
জন্ডিস অনেক সময় মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই বাঁচতে হলে আমাদের সবাইকে জানতে হবে, হতে হবে সচেতন।

শেয়ার করুন

0 মন্তব্য: