স্বাভাবিকের পথে গাছমানব

স্বাভাবিকের পথে গাছমানব। বিরল রোগে আক্রান্ত আবুল বাজেদার এখন স্বপ্ন দেখছেন নতুন জীবনের। চিকিৎসকরাও তাকে নিয়ে আশাবাদী। তারা বলছেন, বাজেদার এখন ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করতে পারেন। পাঁচ আঙ্গুল ভালো। কলম দিয়ে লিখতে পারেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি মানবজমিনকে জানান, আবুল বাজেদারের বাম হাতও ভালোর পথে। তিনি উল্লেখ করেন, সমন্বিতভাবে কিছু করলে ভালো ফল পাওয়া যায় বলে আবুল আমাদের উৎসাহ জোগাচ্ছেন। তার স্ত্রী হালিমা বলেছেন, আমরা খুশি। তার হাতগুলো অনেক হালকা হয়েছে। নাড়াচাড়া করতে পারে। হাত দিয়ে তিন বছরের শিশুকন্যাকে আদর করতে পারে। পা এখনও ব্যান্ডেজ করা আছে। কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌস তাহিরাকে জন্মের পর দু-বাহুতে করে কোনোদিন আদর করতে পারেনি বাজেদার। কিন্তু এখন ধরতে পারছে। এখন হাতে আর শেকড় নেই। বিরল রোগে আক্রান্ত আবুল বাজেদারের প্রথমে এক হাতে অস্ত্রোপচার করে ভারমুক্ত করা হয়েছে গত ২০শে ফেব্রুয়ারি। সাড়ে তিন ঘণ্টার অপারেশনে তার হাতের পাঁচ আঙ্গুলের ওপর বেড়ে উঠা অংশ ফেলে দেয়া হয়েছে। জটিল অপারেশন নিয়ে চিকিৎসকরা সংশয়ে থাকলেও শেষে তারাও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল কালামের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল আবুলের ডান হাতের পাঁচটি আঙ্গুলেই অস্ত্রোপচার করেন ওই সময়ে। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, প্রথমে আবুলের বুড়ো আঙ্গুল ও তর্জনিতে অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত ছিল। অস্ত্রোপচার কক্ষে চিকিৎসকদের তাৎক্ষণিক পরামর্শে আবুলের ডান হাতের পাঁচটি আঙ্গুলেই অস্ত্রোপচার করা হয়। গত ১৯শে মার্চ বাম হাতে অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তার দু’হাতই অস্ত্রোপচার সম্পন হলো। এর প্রায় এক মাস আগে অপারেশন হয়েছিল তার ডান হাত। এরপর পর্যায়ক্রমে চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থা বুঝে হাত ও পায়ের অন্য অপারেশনগুলো করেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পৃথিবীতে বাংলাদেশসহ এখন পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকজনকে এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, রোমানিয়া এবং সর্বশেষ বাংলাদেশে এই রোগী দেখা গেলো। এই রোগী বাংলাদেশে প্রথম।  হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে তার চিকিৎসা হবে। তার জন্য গঠন করা হয় ৯ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। রোগটি ‘ট্রি-ম্যান’ (বৃক্ষমানব) সিনড্রম নামে পরিচিত। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এ রোগ হয়। খুলনার পাইকগাছার এই যুবক গত ১০ বছর ধরে এই রোগে ভুগছিল। তার হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলো গাছের শেকড়ের মতো বৃদ্ধি পায় এবং দিনে দিনে তা বাড়তে থাকে। তাকে গত ৩০শে জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। রাখা হয় বার্ন ইউনিটের ৫১৫ নম্বর কেবিনে। গত ১০ই ফেব্রুয়ারি আবুল বাজেদারের বায়োপসিসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাংসপিণ্ডের টিস্যু, রক্ত ও লালার নমুনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পাঠানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুসারে তিন ধরনের নমুনা সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক ওয়ার্ল্ড কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হয়। ফলাফল শিগগিরই হাতে পাওয়া যাবে বলে ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন। গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি গাছমানব আবুলের চিকিৎসার খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি আবুলের চিকিৎসা খরচ সরকার বহন করবে বলে ঘোষণা দেন। এদিকে জমি কিনে বাড়ি বানানোর জন্য দরিদ্র আবুলকে অধ্যাপক ডা. কবির চৌধুরী ৬ লাখ টাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার স্ত্রী।

শেয়ার করুন

0 মন্তব্য: