ডিম নিয়ে কাণ্ড

এ যেন রীতিমতো এলাহিকাণ্ড। আয়োজনটিই ছিল ব্যতিক্রমী। বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে তিন টাকায় ডিম বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ঢাকার খামারবাড়ীতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ডিম বিক্রি হবে। জনপ্রতি কেনা যাবে সর্বোচ্চ ৯০টি ডিম। এ ঘোষণায় ডিম নিতে জড়ো হয় লাখো মানুষ। কিন্তু আয়োজকরা মাত্র ২০ হাজার ডিম এনেছিলেন বিক্রির জন্য। লাখো মানুষ দেখে ভড়কে যান আয়োজকরা। কিন্তু আট টাকার ডিম তিন টাকায় কেনার জন্য এমন লঙ্কাকাণ্ড যে ঘটবে তা হয়তো আয়োজকরাও কল্পনা করতে পারেননি। ভোর থেকেই আসতে থাকে মানুষ। সকাল ৯টার আগেই কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে হাজির হয় হাজার হাজার মানুষ। পুরো এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। নানা বয়সী, নানা পেশার মানুষ। লক্ষাধিক
মানুষের উপস্থিতি। কারো হাতে বালতি; কারও হাতে খাঁচি। ভিড়ের চাপ, অব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে হাতাহাতি আর পুলিশের লাঠিপেটায় পণ্ড হয়ে যায় আয়োজন। ভিড়ের চাপে ভেঙে যায় প্যান্ডেল আর কাউন্টারে রাখা বেশ কিছু ডিম। ঘটনার সূত্রপাত ঘোষণা অনুযায়ী ডিম বিক্রি না করা। বরং ডিম বিক্রি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়া। এমনিতেই ভোর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ডিম প্রত্যাশীরা অধৈর্য হয়ে পড়ে। এর উপর ডিম বিক্রি বন্ধের ঘোষণায় অসহিষ্ণু হয়ে মঞ্চ লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল, জুতা-পানির বোতল ছুঁড়ে মারতে থাকে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ লাঠিচার্জ করে। গ্রেপ্তার করে কয়েকজনকে।
ডিম না পেয়ে ক্ষুব্ধ ক্রেতাদের অনেকেই বিক্ষোভ করেন। স্লোগান দিতে থাকেন ‘ডিম চাই, বিচার চাই’ বলে। মিরপুর-১২ নম্বর থেকে শাহ আলম ডিম কিনতে এসছেন ভোর ৫টায়। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকনে দীর্ঘ সময়। এ ক্রেতা বলেন, আমি একটা বালতি নিয়ে এসেছি ৯০টি ডিম কিনবো বলে। কোনোভাবে একটি ডিম কিনতে পেরেছি। এমন মেলার আয়োজন করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে। তারা এত অল্প ডিম নিয়ে কীভাবে মেলার আয়োজন করে। রাজাবাজার থেকে ডিম কিনতে এসে খালি হাতে ফিরে যান সীমা বেগম। তিনি বলেন, শুনেছি আজকে কম দামে ৯০টি ডিম কিনতে পারবো। ডিম তো কিনতে পারিই নাই। দুই তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে রোদে পুড়তে হয়েছে। বেলা সোয়া ১১টায় মাইকে ঘোষণা দিয়ে ডিম বিক্রি বাতিল করা হয়। মাইকে বলা হয়, ডিম সঙ্কট থাকায় দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি -আজ ডিম বিক্রি বন্ধ থাকবে। এ ঘোষণার পরই পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে যায়। পুলিশের হস্তক্ষেপ চায় আয়োজক কমিটি। পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে। কেআইবির গেট বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মো. মশিউর রহমান বলেন, আয়োজনের তুলনায় লোকসংখ্যা অনেক বেশি এসেছে। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এ মেলায় এত মানুষ হবে ভাবিনি। আগামীতে আরো বড় করে আয়োজন করা হবে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে বুথ বসিয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করা হবে। আমরা এটাকে ব্যর্থতা বলতে পারি না। ক্রেতার তুলনায় ডিম কম থাকায় বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।
সদস্য বিশ্বজিৎ রায় গণমাধ্যমকে বলেন, ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য এক লাখ ডিম এনেছিলেন তারা। সকাল ১০টায় বিক্রি শুরুর কথা থাকলেও মানুষের ভিড় দেখে ৯টার দিকেই বিক্রি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এত মানুষের চাপে আধা ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে ১০টা বাজার আগেই ডিম বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, মানুষ এত অভূতপূর্ব সাড়া দেবে, তা আমরা ভাবতে পারিনি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। আমরা দুঃখিত। এ ব্যাপারে তেজগাঁও থানার এসআই মৃণাল সাংবাদিকদের জানান, আয়োজকদের ধারণা ছিল না এত মানুষ হবে। পরিকল্পনা ছাড়া এমন আয়োজন করা উচিৎ নয়। তবে পরিস্থিতি আমরা নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছি।
ওদিকে বেলা ২টায় পোল্ট্রি বাংলাদেশ ফেসবুক পেজে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে সকাল ১০টা থেকে প্রতিটি ডিম ভর্তুকি মূল্যে ৩ টাকায় বিক্রি শুরু হয়। ৫০ হাজার ডিম বিক্রির আগাম ঘোষণা দেয়া হলেও সাধারণ মানুষের আগ্রহের বিষয়টি উপলব্ধি করে ১ লাখ ডিম বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়। সকাল ৭টা থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। ৮টার মধ্যে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট এলাকা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত মানুষের লাইন দেখা যায়। উদ্যোক্তাদের চেষ্টা ছিল সবাই যাতে ডিম নিয়ে ফিরতে পারেন। কিন্তু ডিম পাব কি পাব না এই আশঙ্কায় উৎসুক মানুষের মাঝে উৎকন্ঠা থেকে বিশৃঙ্খলা শুরু হয় পুলিশ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে হস্তক্ষেপ করেন। ফলে ডিম বিক্রি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, আমরা সাধারণ মানুষকে একটি বার্তাই দিতে চেয়েছি-তা হলো ডিম একটি পুষ্টিকর খাদ্য এবং সকলেরই ডিম খাওয়া দরকার। আমরা চেয়েছিলাম সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষেরা যেন কম দামে পরিবারের জন্য এক মাসের ডিম নিয়ে যেতে পারেন। সেজন্যই সর্বোচ্চ ৯০টি ডিম দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু বিশৃঙ্খলার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের সিদ্ধান্তে আমরা বহাল আছি। পরবর্তীতে আলোচনা সাপেক্ষে হ্রাসকৃত মূল্যে ডিম বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে। এদিকে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি মৎস ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, ডিম আমাদের প্রধান আমিষ খাদ্য। সুস্থ সবল থাকতে আমাদের প্রতিদিন ডিম খাওয়া দরকার। আমি প্রতিদিন সকালে একটি করে ডিম খাই। আজকে আপনাদের কম মূল্যে ডিম বিক্রির কথা শুনে সাধারণ মানুষ এসেছেন ডিম কিনতে। আপনাদের উচিত ছিল বিভিন্ন বুথের মাধ্যমে প্যাকেটে করে ডিম বিক্রি করা। তাহলে তাদের এরকম কষ্ট হতো না। তাদের খালি হাতে না ফিরিয়ে কীভাবে সুষ্ঠুভাবে বিক্রি করা যায় সে ব্যবস্থা করবেন।

শেয়ার করুন

0 মন্তব্য: