আগামী বছর থেকে নতুন পদ্ধতিতে এসএসসি পরীক্ষা: শিক্ষা সচিব

 
নিজস্ব প্রতিবেদক-
শিক্ষা সচিব মো.সোহরাব হোসাইন বলেছেন, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে পরীক্ষা পদ্ধতি পাল্টে ফেলা হচ্ছে। আগামী বছর থেকে নতুন পদ্ধতিতে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে। 
প্রশ্নফাঁস নিয়ে বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে রুল জারির পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
বৃহস্পতিবার এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস রোধে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এ সংক্রান্ত্র রুলের পর মন্ত্রণালয়ের অবস্থান জানতে চাইলে মো. সোহরাব হোসাইন এ কথা জানান।
তিনি বলেন, পরীক্ষার বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তনে আমি নিজে কাজ করছি। একটি উপায় আমরা অবশ্যই বের করবো এবং বিশেষজ্ঞদের এ কাজে সম্পৃক্ত করবো। নতুন পদ্ধতিতে আগামী বছর থেকে পরীক্ষা নেওয়া হবে। যে পদ্ধতি নিয়ে জনমনে আর কোনও প্রশ্ন থাকবে না।
সচিব বলেন, আগে মানুষের নৈতিকতা ছিল উন্নত। তখন প্রশ্ন কোনো স্থানে ফাঁস হলেও তা একজন আরেকজনকে বলতো না। লজ্জা করতো। ভাবতো আমাকে খারাপভাবে নেবে। এখন তা নয়। এখন নিজের থেকে অন্যকে প্রশ্ন অনলাইনে পাঠিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, এখন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস জানান দিচ্ছে। এটা গার্ডিয়ান থেকে শুরু করে সকলের মধ্যে এ প্রবণতা শুরু হয়েছে।
সচিব বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পথ বের করতে ২০১৪ সালে একটি কমিটি হয়েছিল। সেখানে আমি কমিটির প্রধান ছিলাম। খুটিনাটি সবগুলো বিষয় দেখে আমরা নিজেরাই বলছিলাম বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে এখানে প্রতিটি প্রশ্ন ফাঁস হওয়া স্বাভাবিক। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করতে হবে; যে প্রক্রিয়ায় প্রশ্নফাঁস হওয়ার অবকাশ থাকবে না। আর তাতে সকলে মিলে এগিয়ে আসতে হবে।
সচিব বলেন, এমসিকিউ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কতটুকু ভালো উদ্যোগ সে বিষয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। এই পদ্ধতিটি খুবই ঝামেলা করছে। এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমি মনে করি, প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে এমসিকিউ অনেকাংশে দায়ী।
সেসব বিষয়ে প্রশ্নফাঁস হয়েছে সেসব বিষয়ের পরীক্ষা বাতিল হবে কিনা জানতে চাইলে সচিব বলেন, এখনই বাতিল নয়, যাচাই-বাছাই কমিটি যে প্রতিবেদন দেবে, সেই কমিটির দেওয়া প্রতিবেদন পর্যালচনা করতে আরও একটি কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে যে সুপারিশ করবে, সেই সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গ সচিব বলেন, আমরা আমাদের কর্মকর্তাদের কোর্টে পাঠিয়েছি। কোর্ট কী আদেশ দিয়েছে সেটি সংগ্রহ করার জন্য। আমি এখনও আদালতের রায় হাতে পাইনি। জানি না সেই আদেশে কী আছে। তবে অবশ্যই আদালত যে আদেশ দেবে সেটি আমরা পরিপূর্ণভাবে পালন করবো। তিনি ফিরে এলে আমরা একসঙ্গে বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবো। ইতোমধ্যেই ঢাকা বোর্ডের আইনজীবীকে নির্দেশ দিয়েছি আদালত থেকে আদেশের নকল কপি তুলতে। তা দেখে আদালত যে আদেশ দিয়েছেন তা অবশ্যই পরিপালন করবো।
প্রশ্নফাঁসের হোতাদের ধরতে এর মূলে পৌঁছানোর জন্য গোয়েন্দা বাহিনী আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন মো. সোহরাব হোসাইন।
১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত  ১০টি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা প্রথম পত্রের বহুনির্বচনি অভীক্ষার ‘খ’ সেট পরীক্ষার প্রশ্ন ও ফেসবুকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল ছিল। পরীক্ষা শুরুর একঘণ্টা আগেই তা ফেসবুকে পাওয়া যায়।
৩ ফেব্রুয়ারি সকালে পরীক্ষা শুরুর প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিক (বহুনির্বচনি) অভীক্ষার ‘খ’ সেটের উত্তরসহ প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় ফেসবুকে। যার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া যায়।
৫ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা শুরুর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে সকাল ৮টা ৪ মিনিটে ইংরেজি প্রথম পত্রের ‘ক’ সেটের প্রশ্ন ফাঁস হয়। যার সঙ্গে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৪৮ মিনিট আগে সকাল ৯টা ১২ মিনিটে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের ‘খ’ সেটের গাঁদা প্রশ্নপত্রটি হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে পাওয়া গেছে। যা অনুষ্ঠিত হওয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে।
৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার বহুনির্বচনি অভীক্ষার ‘খ’ সেটের চাঁপা প্রশ্নপত্রটি পাওয়া যায়। এটিও অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ৫৯ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে গণিতের ‘খ-চাঁপা’ সেটের প্রশ্নপত্রটি পাওয়া যায়, যা অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
এছাড়া আইসিটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ৫১ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে আইসিটির ‘ক সেট’ প্রশ্ন পাওয়া যায়। আর সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ‘গ সেট’র প্রশ্নও ফাঁস হয়।
১৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বসভ্যতা বিষয়ের পরীক্ষা শুরুর আগেই হোয়াটসঅ্যাপে পদার্থবিজ্ঞান, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে। এদিন সকাল ৮টা ৫৮ মিনিটে পদার্থবিজ্ঞানের বহুনির্বচনি অভীক্ষার ‘গ সেট’র প্রশ্ন উত্তরপত্রসহ হোয়াটসঅ্যাপে পাওয়া গেছে।
আর আজ বৃহস্পতিবার রসায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসব পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু শিক্ষার্থীসহ কিছু হোতাকে গ্রেফতার করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

শেয়ার করুন

0 মন্তব্য: